বসন্ত সিরিজ
পিকনিকের গল্প
এ বসন্ত পিকনিকে, পরিত্যক্ত শহর ছাড়িয়ে
ট্রেন থামা ওঠা নামা তার মাঝে স্থাণুবৎ থাকি...
কিছু স্টপ চেনা আছে অচেনাই থাকবে বাকীরা
সবুজ বিরল চোখে লেগে থেকে অকৃপণ ধন ।
কিছুই চেনা হয়নি পথঘাট তাই হাতড়াচ্ছি
কতকিছু পার করে কতদূর এ বসন্তে যাব ?
শিমুল গাছে বসন্ত বাসা বাঁধে ঝলমল লালে
তার জন্য আসা যায়- এই অবান্তর সন্ধ্যাপথে !
ওয়েব যতই থাক, ছায়াগুলো পথ চেয়ে থাকে
হাওয়ার লেখা থাকে অন্ধকার গল্পের খোরাক...
যেভাবে ভাসতে থাকা কোলাহলে থেমে যায় ট্রেন
পলকা শিশির হয়ে টুপ করে খসে যায় প্রাণ ।
ট্রেন যাত্রা
প্ল্যাটফর্ম বসে থাকে, আশপাশে চলে যায় চাকা
দূরদূরান্তের গল্পে, ছায়াঘেরা বিদ্যুৎ শাসনে
তোমার দিকে এগোতে ধরি ন’টা ‘বর্ধমান মেন’
বেশ ফাঁকা ট্রেন ছাড়ে, জানলায় কার ছবি দেখি !
যাওয়ার কথা ছিল একা একা, তুমি উপলক্ষ্যে
আকাশছোঁয়া সবুজে ভেসে যায়, তরঙ্গ সংকেতে
নথিতে শস্যভাণ্ডার হয়ে ছিলে এখন নগরী...
কতবার যেতে চাই কার সাথে শান্তিনিকেতনে ।
কতদূর যেতে পারি একা একা যন্ত্রণা যাপনে,
বেদেনির সাপ-ঝাঁপি মিশে যায় সর্পিল যাত্রায়
ফেরিওলা-নিত্যযাত্রী কবেকার সুর মেখে থাকে
তাপ্পি মারা জুতো জামা ‘চিরঞ্জীব’- কপালে তিলক...
আমি তার মতো করে পাড়ি দেব সংসার সমুদ্র
যেভাবে মেন লাইন পার হচ্ছি ধুঁকতে ধুঁকতে ।
বাসন্তী
এত দৌড়োদৌড়ি এ বসন্তেই সম্ভব...
আকাশ যেন মেঘলা আজ ডালহৌসির রাস্তায়,
গরমে যে কি হবে ভেবেই ঘেমে উঠছি -
লুকিয়ে পড়তে হবে কোনও ঠাণ্ডা চোরকুঠুরিতে ।
আমার দ্বিধাময় সংলাপে যে ক্রমে হয়েছে দৃঢ়-
সহৃদয় এই বিস্মৃতিতে মনে করেছি তোমাকে
বন্ধুবান্ধবহীন হলে সে ভরসা দেব বলেছিল,
বেশী দূরের এ কথাবার্তা না ভাবাই ভাল বরং...
কষ্ট পাওয়া নির্দিষ্ট জেনে ভাঙতে চেয়েছ যদি
অনির্দিষ্টে এ নৌকা ভাসানো যোগাযোগহীন হয়ে
সব অর্থে ভাগ্যবিড়ম্বিত, ঠিকই চিনেছ দেখে
কোথাকার ছদ্মবেশী মন কাঁদে বসন্ত বাঁশিতে ।
আদুরে
কিছু জল ছুঁয়ে দিক তোমার কপাল
জ্বরঘোরে ক্যালপল বসন্ত বান্ধবী
ভরদুপুরের ঘুমে ছিঁড়ে বাঁচা...
অতর্কিত ফোন, কলার মান্দাসে অচেনা শহর ভ্রমণ ।
তোমার কথা পাহাড় পেরোতে ছুটেছি
স্মৃতি বয়ঃসন্ধি ব্রণ ম্যাজিকে চোখা কাটাকুটি
কবচ কুণ্ডল সব খুলে একে একে
ঝড় বাদলের ঢেউ তোমার শরীরে ।
ট্রেনের লেবু লজেন্সে কে প্রতীক্ষাহীন,
‘এসে গেছি মালকিন’ স্টেশনে তোমার
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সম্পর্কের সুচিছিদ্রে গাঁথা
তিন দশকের অবেগ- বড় খালি লাগে ।
অতৃপ্ত ছায়ায় বসে
কতদিন দেখাশোনা নেই, তবু কি আশ্চর্য স্মৃতি
খেলছি না ভাঙছি গড়ছি দল বেঁধে আস্টেপৃষ্টে...
কবেকার কথা হয়ে গেছো এ চৈত্র আসনে বসে,
কতবার ভেবেছি তোমাকে ছায়া হয়ে গেছো বলে।
কতবার বলেছিল রাই ‘আমার সাথে ডুববে’
আদর শব্দরা তবু যেন কাঁপতো বিরহ শোকে,
কোথাও বাঁশি বেজেছিল হারানোর কথা ভেবে -
সেই থেকে আছি অপেক্ষায় যখ সেজে পাহারায়।
সিনেমা হলের অন্ধকারে হতে চাই ক্রমে লীন
তোমার শরীরে বাণ এলে আমার অনন্ত তৃষ্ণা,
সে কাঁপতো বসন্তের সুখে এক হয়ে যতবার-
খোঁচা খেয়েছিল অতীতের গেরুয়া গাজন সুরে।
মুহূর্ত কথা ভুলে শরীর বেজে উঠত
উচ্চগ্রামে বাঁধা কোন তারে, তোমাকে ভুলে
নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ, মাঝখানে তুমি এসে
দাঁড়ালে শনিবার সন্ধেয় শ’মাইল দূর থেকে ।
অভিমান মানায় তোমাকে ভবিষ্যত চিন্তায়,
আমি তখন খুঁজে বেড়াচ্ছি এক থেকে অন্য নারী
সেই সংক্রান্তির অপেক্ষায় ।
কৈশোরের স্বপ্ন
সব ছেলের কৈশোরে কেউ পরি হয়ে থাকে-
তারা হারিয়ে যায় ভোরে বাস্তবের চাপে,
ক্রমে অলৌকিক ডানা ভেঙে গিয়ে রক্তার্ত হয়েছে
স্বাধীনতার নামে সে কার কাছে কি বেচলো কবে?
শুধু বসন্ত সকালে মনে হয় স্বপ্নসুন্দরী সে...
পরিপূর্ণ আলো হয়ে ছুঁয়ে ফেলে নিত্যযন্ত্রনাকে,
আগের রাতে শিশিরে লেগে ছিল ফুলের আগুণ
তার পলাশ তখন ঝলসেছে কপাল পুড়িয়ে ।
দুঃস্বপ্নের ঘুম ভেঙে গোপনীয় কৈশোরের বন্ধু
পথ হারানো দুপুরে কার সাথে দেখা হয়ে যায় ?
কেউ তাকে খুঁজে ফেরে, সুদিনের অপেক্ষায়...
খোলামকুচির লেখা মনে রেখে হেঁটে যায় একা !
বয়স হচ্ছে
‘পথ চেয়ে বসে আছো কারো’ শুনলেই হাসি পায়
আজকাল পদাবলী চলে ? ‘আর ঢং করো না গো’
অনেক পথ পেরিয়ে যাব সকালের গল্প ঘিরে,
অভিমান অথবা ন্যাকামির ঋনাত্মক উচ্চারণে
সিগারেট ভ্রমে ছাই করি কার অদম্য বিশ্বাস ।
সুপ্রভাত বলিনি বলে কি আলো নিভে আসে ক্রমে,
পাঁকালের খোঁজে পাঁকে নামি অনন্ত শূন্য আশ্রয়ে
সঙ্গে তুমি আছো কিংবা নেই, নদীর সাথে চলতে
ভিড়ে মিশে গিয়ে আমাদের নিঃসঙ্গ থাকতে হয়,
একা পেসেন্স খেলতে হয় আয়ুরেখা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ।
বান্ধবী
তোমার আমার সম্পর্কের মধ্যে লজ্জা গালাগালি
ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তোমার অতীতের ঝগড়া
আমার-তোমার শহর বন্ধু বান্ধবী খুনসুটি
সবাই ঢুকে পড়ে, শুধু আমরাই দূরে সরে যাই ।
অনেক কাজ পড়ে আছে, অতীতের মতো সুবাসে
এ সুতানুটি রিক্সায় কার সাথে বসন্ত বিলাস?
অলস বেলায় কার জন্য জ্বর...
আলতো হাওয়ায় আমি অকারণে কার কথা ভাবছি !
বিরক্তি
ফিউচার প্ল্যান ছেড়ে দিচ্ছি রান টাইমের হাতে,
ব্যক্তি থেকে সমষ্টির আজন্মের সঙ্গী -
ভোট ময়দান থেকে টি টয়েন্টি ম্যাচ সব মিথ্যে ।
ক্রমে সরতে চাইছি দূর থেকে দূরে, ঘরবাড়ি ছেড়ে
উদাসীন মুখে বসে ট্রেনের জানলায় কাকে দেখি-
সে কোথাও নেমে গেল,তবু বসে আছি একা একা ।
তুমি তো এরকমই, আমিও অভ্যস্ত এভাবেই
এক্সপ্লেন করতে নতুন শব্দের কি দরকার !
এই মুড ওঠানামা অযথা বিতণ্ডা ভাব আড়ি
আবার হঠাৎ করে আহ্লাদি করিস যথারীতি,
‘যতসব পাগলামি’ ঘাড় নিচু করে বসে থাকা
মাঝে মাঝে বহু কথা... কখনো নিশ্চুপ একদম ।
রহস্য
ঠাকুর দেবতার মুখ ঝাপসা হয়ে এলে
কে কাকে ডেকে নেয়, সাবেক বৈঠকখানায়
মৃত্যুদাগ মুছিয়ে দেয় কে অনীহার রাজরোগে !
ইচ্ছে করে কষ্টভোগ শিখিয়েছ তুমি,
অপশন আর কামনার দ্বন্দে ভুলে থাকো -
যেমন ঝুলে থাকে চাঁদ টানাপোড়েনে নিঃস্ব
হাতে আঁকা অতীতের সেটে !
গা দিয়ে বয়ে যায় নদী...
মাটিতেই ফিরে যায় মাটির জিনিস
আদর শেখালে যদি,আবেশে অসুখ
উপবাসি শহর উথলে জিত নাকি হার !
শারিরিক উৎসাহ আগুণ গিলে খেয়ে
প্রবল উষ্ণতার গভীরে গতি সঞ্চারিত হলে
সুতীব্র সেই পরুষগন্ধে পাগল হয় কে !
ডাক
আমাদের মৃত গান বাড়াচ্ছে উষ্ণতা
অন্ধকার ফুটপাতে কার হাতছানি,
সাতটা ফুটোয় সুর খেলাচ্ছে পাগল
চরাচর ছুঁয়ে থাকা উদাসীনতায় ।
‘কোমল নি’ থেকে আসা রাখাল ছেলেরা
কতটা দূরের পথে প্রাণের আবেশে,
মাতাল ঘোড়ারা বোঝে জরায়ুর জ্বালা
নাছোড় বাঁশিতে ডাকে পতিতা রাধাকে ।
গোপন কথা
খুব গোপনে ভালবেসেছো, গভীর রাতে
একলা ঘরে বালিশ কাঁদে, নাইটল্যাম্পে
চোঁয়াঢেকুরে লেখা হয়েছে রাত আদর ।
কতদিন ঘুম দুপুরে সে হাত ধরলে
পাথর খুঁজে পেল ঠিকানা, আষাঢ়ে পদ্যে
অতীত হয়ে লেখা থাকে যে শোক পোষাকে ।
উড়ে চলে গেছে ভুল গাওয়া একটা পাখি
এর’ম দিনে কার হাত ধরে উজানে যাবে,
কার সাথে কার দেখা হয়ে যাবে টুরিস্ট স্পটে ।
যার নাম নেই, স্মৃতির মুখ মুছিয়ে দিয়েছ
ক্রমশ দূরে সরতে গিয়ে এসেছ কাছে,
তার শরীরে রেখে এসেছ গোপন কথা ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন