আমাদের নব্বই, আমাদের হইচই
“কোথা থেকে এলাম আমি, কে সৃষ্টি করল আমাকে, আমাদের, কে সৃষ্টি করল এই বিশ্ব, এই ব্রহ্মান্ড ?” মানুষের চিরন্তন জিজ্ঞাসা এইসব। সভ্যতার আদি থেকে মানষের চেতনায় ফুটে উঠেছে এই প্রশ্নগুলি। আর সভ্যতার বিভিন্ন স্তরে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঈশ্বরের ধারণা, এক মহাশক্তির কল্পনা আমাদের চেতনাকে চালিত করেছে, আমরা জানি। গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধর্মমত। বিভিন্ন ভাবে ব্যাখা করা হয়েছে সৃষ্টি রহস্য। বারবার উঠে এসেছে সেই অসীম শক্তিধরের কথা, যিনি নাকি বানিয়েছেন এই জড় ও জীবজগৎ, পাশাপাশি ঈশ্বরকে অস্বীকার করেছেন নাস্তিকেরা। আর বিজ্ঞান খোঁজ চালিয়েছে এই সব কুহকের, এই সব রহস্যের উত্তরের।
প্রাণ কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে জন্ম হয় যে কোনো প্রাণীর, জন্ম হয় মানুষের তা বিজ্ঞান আমাদের জানিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানকে আমরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছি, তুমি পারো নিজে প্রাণ তৈরি করতে। মানুষ কৃত্রিমভাবে বানানো আইনসিদ্ধ নয় এখনো। তাই মানুষের কাছাকাছি কোনো প্রাণী, স্তন্যপায়ী কোনো প্রাণী বানিয়ে ফেলা ছিল বিজ্ঞানের কাছে একটা পরীক্ষা।
১৯৯৬ সালের ৫ই জুলাই জন্ম নিল ডলি। স্কটল্যান্ডের এডিনবরার রসলিন ইন্সটিটিউটে। ডলি, একটি ভেড়ার নাম, ক্লোন করে ল্যাবরেটরিতে জন্মানো প্রথম স্তন্যপায়ী। Ian Wilmut, Keith Campbell ও তাঁদের সহকারীরা একটি গৃহপালিত ভেড়ার স্তনগ্রন্থির কোষ নিয়ে, তাকে ক্লোন করে, তাকে বাড়িয়ে তুলে বানিয়ে তুললেন আরেকটি পূর্ণাঙ্গ ভেড়া, ডলি। ১৪ই ফেব্রুয়ারি , ২০০৩, সে মারা যায়। তার আগে তার শরীরের কোষ ক্লোন করে তৈরি করা হয় তার সন্তানদের, বনি, স্যালি, রোসি, লুসি, ডারসি আর কটন।
এবং পৃথিবীর বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে অন্যান্য বিভিন্ন প্রাণীর ক্লোনিং সফলভাবে হতে থাক এরপর।
এটা যে বিজ্ঞানের একটা বিশাল সাফল্য শুধু তাই নয়। আমাদের জীবনদর্শন, সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে আমাদের বোধ একধাক্কায় বদলে দেয় এই আবিষ্কার যে, প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে, কোনো ঐশ্বরিক শক্তির সাহায্য ছাড়াই মানুষ তৈরি করতে একটি প্রাণীকে।, হ্যাঁ, মানুষও এই ভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব যদি আইন অনুমতি দেয়। হ্যাঁ, সেটা
পারে মানুষই।
তাহলে ঈশ্বর ?
তাহলে সৃষ্টিকর্তা?
এই যে পৃথিবী, এই যে সূর্য-চন্দ্র-তারা, এই ব্রহ্মান্ড কে তৈরি করল? আর তা চলছে কার নির্দেশে? কী সেই নিয়ম যা চালিত করে সব কিছু? অণু পরমাণু থেকে বিশালকার গ্যালাক্সি, কী সেই নিয়মে চলছে?
এই খোঁজ বিজ্ঞানীদের চিরকালীন । কোপার্নিকাস , গ্যালিলিও, ডালটন, নিউটন, আইনস্টাইন, নীলস বোর থেকে স্টিফেন হকিং। পদার্থবিদ্যার এই যে উত্তর খোঁজা তা আসলে প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের সেই কৌতূহলকে উস্কে দেয় , আমি কোথায় আছি, কেন আছি।
মধ্যাকর্ষণ , আপেক্ষিকতা বাদ , কোয়ান্টম তত্ত্ব এই সন্ধান করেছে ঠিকই , কিন্তু সৃষ্টির পুরোটা যেন কিছুতেই নাগালের মধ্যে আসছিল না।
সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ আর কোয়ান্টাম তত্ত্ব, এই দুই মডেলকে কেন্দ্র করে গত শতকের পদার্থ বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে। যদিও অণু পারমাণুর গঠনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রেক্ষিত কোয়ান্টামের আগ্রহ আর মহাবিশ্বে নক্ষত্রপুঞ্জের ব্যপ্তিতে আপেক্ষিকতার , তবু এই দুই তত্ত্বের সমন্বয় করার চেষ্টা চালিয়ে যান বিজ্ঞানীরা। হাইজেনবার্গ, প্ল্যাঙ্ক প্রমুখ কোয়ান্টাম তাত্ত্বিকদের সাথে আইনস্টাইনের প্রবাদপ্রতিম বিবোদ সত্বেও অনেকেই মনে করতেন যে, এই দুটি ধারণার মিলিত রূপই সঠিক ব্যাখ্যা করতে পারবে সৃষ্টিকে। এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় ‘ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি’-র তত্ত্ব। আর এখান থেকেই স্ট্রিং থিওরি।
এই ব্রহ্মান্ডে ক্রিয়াশীল চারটি বল , তড়িৎ চুম্বকীয় , অভিকর্ষ , প্রবল ও দুর্বল পারমাণবিক বল । যদিও এরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশিত ও ক্রিয়াশীল কিন্তু স্ট্রিং থিওরি এদের সমতা বিধান করে। ব্রহ্মান্ডের আদিতে এই বলগুলির মধ্যে ‘স্ট্রিং’ ক্রিয়াশীলতাকেই সূচিত করে।
স্ট্রিং?
হ্যাঁ, তন্তু।
কোনো পদার্থ যেমন অণু দিয়ে গঠিত, অ্ণুকে ভাঙলে পরমাণু, পরমাণুর ভেতর ইলেকট্রন, প্রোটন, নিয়ট্রন। তার চেয়েও চোট কোয়ার্ক। স্ট্রিং হল বিন্দুবৎ , যার একমাত্রা, একটিই ডায়মেনশন যার, যা হল শক্তির তন্তু, filament of energy. এই মতবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করা হয় সমস্ত কিছুর গঠন ও সমস্ত বলের কার্যকারিতাকে। বেশ কিছু স্ট্রিং মডেল ও তাদের বেশ কিছু ব্যর্থতা থেকে উঠে আসে সুপারস্ট্রিং থিওরি।
বোসন ও ফারমিওন কণার ধারণা, একের পর এক আমাদের না-দেখা ডায়মেনশনের ধারণা। অবশেষে, ১৯৯৫ সালে Edward Witten প্রস্তাবনা করলেন M-theory-র । M মানে membrane, M মানে magic, M মানে mystery । এমন একটা ধারণা যা পদার্থবিদ্যার সকল তত্ত্বকে এক করে ফেলার মতো একটা গাণিতিক কাঠামো। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত স্টিফেন হকিং-এর বই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান নিয়ে উৎসাহ বাড়িয়ে দেয় পরবর্তী কয়েক বছরে। এই ভাবে বিজনচেতনায় একটা theory of everything-এ পোঁছনোর প্রচেষ্টা , যেন একটা দার্শনিক সামগ্রিকতা পায় এতদিনে।
নব্বই দশকটা শুরুই করেছিলাম আমরা ১৯৯০ সালের ২৫শে এপ্রিল মহাকাশে hubble space telescope স্থাপন করে, এমন একটা টেলিস্কোপ যা নিজেই থাকবে মহাকাশে, আর সেখান থেকেই তার শক্তিশালী লেন্সে তোলা দূর মহাকাশের ছবি পাঠাবে পৃথিবীতে আমাদের কাছে। হাবলের পাঠানো এই মহাবিশ্বের গঠন, বর্তমানের অবস্থান, পরিবর্তনশীল প্রকৃতি ও এই সবের নিরিখে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারনা আমূল বদলে দেয়।
আমরা বুঝতে পারি আমাদের ইউনিভার্স একমাত্র নয়, এমন অজস্র ইউনিভার্স নিয়ে গঠিত মাল্টিভার্স ।
এমন এই মহাজগৎ সৃষ্টি থেকে চলছে নির্দিষ্ট নিয়মে।
মাল্টিভার্সের ভেতর কোটি কোটি ইউনিভার্সের একটি ইউনিভার্সে, তার কোটি কোটি গ্যালাক্সির একটি মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে , কোটি কোটি নক্ষত্রের একটি সূর্যের একটি গ্রহ পৃথিবীর কোটি কোটি প্রাণের একটি আমরা, মানুষ।
মানুষ, যার চেতনা আছে, যে ব্যাখ্যা করতে পারে নিজের অস্তিত্বকে, ব্যাখ্যা করতে পারে নিজের চারপাশকে, এই সৃষ্টিকে।
আমাদের সাথে এমন কোনো দ্বিতীয় প্রাণীর দেখা হয় নি এখনো যারা আমাদের মতো এবং ডলির জন্ম জীববিজ্ঞানে আর M-theory পদার্থবিদ্যায় আমাদের জীবন সম্পরকে সব ধ্যানধারণাকে বদলে দেয়।
বিশ্বের জনক ও পালনকর্তা হিসেবে কোনো অতীন্দ্রিয় ধারণাই আর টিকল না এবং দর্শনগত ভাবে আমরা, মানুষেরা স্বাধীন হলাম , তা আমাদের নব্বই-এ।
(ক্রমশ)
জিও পার্টনার।কি শুরু করলি।অসামান্য শুরু। শুধু চলতে থাকুক।আমাদের বাইফোকাল আর না সরানো চোখ গুলো এভাবেই জমাট বেধে বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে পড়ুক তোর অক্ষরে। আর ভালবাসায়।
উত্তরমুছুন