১ : দীপঙ্কর দত্তর কবিতা :: কবি : দীপঙ্কর দত্ত
গত আশির দশক থেকেই বাংলা কবিতায় এক অন্য কালচার শুরু হয়।পোষাকি চুনুমুনু মার্কা ভদ্দর আভিজাত্য ছেড়ে বাংলা কবিতায় প্রসারিত হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপ্তি।শুরু হয় একরৈখিকতা থেকে বহুরৈখিকতায় উত্তরণ,আর এর গঠনগত বা দর্শনগত পূর্ণ বিকাশ - স্তর থেকে স্তরীয়তে পৌঁছে যায় ৯০এর মাঝামাঝি।অনেক কবিই বাজার কেন্দ্রীকতাকে গ্রাহ্য না করে শুরু করেন নিজের নিজের মতো ভিন্ন ধারার কবিতা,যা কখনোই আর থেমে থাকে নি শত বাজারের প্রলোভনে।আর এখানেই আমরা পাই এক বিশেষ ধারার আবর্তন ও আরো বিশেষ কিছু।পেয়ে যাই পাওয়ার পোয়েট্রি,কবি দীপঙ্কর দত্ত ও শূন্যকাল।পাওয়ার পোয়েট্রি কি ও কেন?উত্তরে বলা যায়
ভাষা দিয়ে ভাষার কাটাকুটি বা দর্শনকে দর্শনগত বিরোধীতা এমনভাবে,যাকে ভদ্দরলোকের গোপন ছেনালিও ভয় পায়।কবি দীপঙ্কর শুরু করলেন ডেসট্রাকশন্।নিউরো ঝড়ে উনি শব্দকে বৈঠকি সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করলেন।যা এর আগে হাংরি সাহিত্যিক বা কবি বিনয় মজুমদার বা আরো কয়েকজন শুরু করেছিলেন।কবি দীপঙ্কর আনলেন শব্দজ হাতুড়ি,যার অদৃশ্য সঙ্গম-কম্পাঙ্কে পাগল বা হ্যাংওভারে ভরে ওঠে ঢোঁড় মগজ।দীপঙ্কর সারা জীবনে খুব বেশি লেখেন নি,তাই অতিব সহজলভ্য তিনি কখনোই নন্।তবুও তিনি যখন কবিতায় কালাশনিকভ চালান - কুর্নিশ করতেই হয়।একটু উদাহরন না হলে হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে,তাই দু-চার লাইন ফ্লুটস্যাম কবিতা থেকে........
"কশে চাবুক মারো,
চিড় খাওয়া জল মুহূর্তে জুড়ে যায় ফের
শুধু কোপানো,খুবলানো পিঠ,পাছা ও পাঁজরগুলি
হাঁ হয়ে থাকে
ব্যাসিলাময় রৌদ্রের সিরাম,নোসোডগুলি
ছুঁয়ে যায় জায়মান বীজ ------"
(বইটি কলকাতা বইমেলা ২০০৭এ প্রকাশিত।প্রকাশক : দিল্লি হাটার্স)
২ : তমোনিদ্রা : ছাইমাখা ভোর :: কবি জহর সেনমজুমদার
ভাষাগত দর্শনে ভাষার কিছু শব্দগত সীমাবদ্ধতা থাকেই,তবুও এই সীমাবদ্ধতা ছিড়ে যারা মহাশূন্যকালীন আবহে নিজেদের নিংড়ে দিতে চান - তাদের কি নামে অভিহিত করা যায়?বলা ভালো মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে ইতিহাসও তাদের কিভাবে দেখবে?
এমনিই এক চিত্রকল্পের শব্দগত গ্রাফিক্স চারপাশে ছড়িয়ে দেওয়া কবি জহর সেনমজুমদার।গত ৯০ দশকে বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা ছিল স্যুরিয়ালিস্টিক ধারা।সেই কাজে আজও কবি জহর সেনমজুমদার যে স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছেন তা এক বিশেষ অনুভূতির যে নন-লিনিয়ার কোলাজ,তা আর অস্বীকারের উপায় নেই।হয়তো অনেকেই বলবেন স্যুরিয়ালিস্টিক ধারা আবার কি?তবু বলা যায় প্রতিটা কবিতাই ভিন্ন স্বাদের।
বইটিতে মোট ২৬টি কবিতা আছে,এবং একটু ভাবলেই বোঝা যায় - জীবনের শুরুবাদে প্রকৃতিতে যে ফাইভ এলিমেন্টস্ আছে,প্রতিটা কবিতাতেই তা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।যেমন সিড়ি কবিতায় -
"আজ লিখবো;খুব লিখবো;অন্ধকার নিশ্চুপ গাছতলা অন্ধকার নিশ্চুপ গাছতলা;চারিদিকে ভ্রমরের ঘূর্ণি পড়ে আছে;চারিদিকে মধুবাক্সের ঘূর্ণি পড়ে আছে;মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগে পিতামহ বলেছিল,তোর হাতে লেখা দিয়ে গেলাম;কিন্তু কই?"।
এক অদ্ভুত সিক্যুয়াল থেকে বহুস্তরীয় সিক্যুয়ালে অনায়াসে বিচরণ করে প্রতিটি কবিতার শব্দকল্প।কোষ থেকে কোষে - এক অদ্ভুত যোগাযোগ স্থাপন,যার উপলব্ধিতে শুধু একটি কথাই হয়তো বলা যায় - কবিতা শুধুই বহুস্তরীয় বা বহুরৈখিক নয়,এ এক সাংঘাতিক বহুগামিও বটে।
(বইটি এবারে ২০১৭ কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত।প্রকাশক : আকাশ।)
৩ : ওভারডোজ :: কবি : সৈকত ঘোষ
বিশুদ্ধ ভাষা কি?বা আদৌ কি তা সম্ভব?অন্ততপক্ষে এই ২০১৭তে দাঁড়িয়ে যখন তথাকথিত এলিট সমাজে আস্তেআস্তে ঢুকে পড়ছে ভিন্ন ধারার প্রান্তিক ও সাব-অলটার্ন শব্দ প্রবাহ।যখন কুমীর জল-কে নেমেছি অবস্থান ছেড়ে ভাষা হয়ে উঠছে সাবলম্বি / প্রাপ্তবয়স্ক / বহুগামি।সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে - আগামী ৫০ বছর পর ভাষা চরিত্র কেমন হয়ে উঠবে?তাই বর্তমান সময়ে যারা কবিতা লিখছেন বা হয়ে উঠছেন অভিধান বহির্ভূত - তারা সকলেই লেখনীতে এক ভিন্নতর উত্তর খুঁজছেন।এমনই এক কবি হলেন সৈকত ও এমনই এক দর্শন খুজে নেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত কবিতার বই হলো ওভারডোজ।
বইটিতে মোট পাঁচটি পর্যায় আছে,তাতে যে কটি কবিতা আছে - তা মূলতঃ সাধারন দৃশ্যগুলির ভিতর থেকে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকে অনুভূত দর্শন।ভয় প্রতিবাদ কামণা রোমান্টিসিজম - সবকটিরই আদর্শগত শব্দরূপ প্রতিটি লেখা জুড়ে।এক আত্মঘাতী ই-বিস্ফোরক রয়ে গেছে নাভি থেকে স্নায়ুর রন্ধ্রেরন্ধ্রে।একটু উদাহরণ না দিলে হয়তো বিস্ফোরণের প্রকৃতি মাত্রা বোঝা বা বোঝানো - কোনোটিই সম্ভব নয়।তাই "ওভারডোজ" সিরিজ থেকে কয়েক লাইন.....
"প্রতিদিন আরো বেশি করে ম্যাগনেটিক হচ্ছি
মিস ইউনিভার্স হতে সীতাকেও ব্রেসিয়ারলেস হতে হবে
চোখ বুজতেই জল থেকে উঠে আসে ফেয়ারিটেল কন্যারা......."
অথবা
"আমি কেন্দ্রমুখী এবং বহির্মুখী উভয় ক্ষেত্রেই
যে গাণিতিক এক্সপ্ল্যানেশন পেয়েছি
তাতে বেদ এবং আর্কিমিডিস একই কথা বলে"
(বইটি ২০১৭ সালে কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত। প্রকাশক : কবিতা পাক্ষিক)
৪ : ব্যালেরিনা :: কবি : মহাদেব নাথ
বেদান্তবাদীদের মতে পৃথিবীর সকল উপকরণের পরিক্রমা শূন্য থেকে শুরু হয়ে শূন্যে শেষ,এবং শূন্য পরবর্তী অবস্থানে রূপান্তর।যে কারণে শূন্য একটি অপরিহার্য ধ্রুবক শুধু নয়,আরো বিশেষ কিছু।শূন্য পরবর্তী অবস্থান - কথাটি জটিল ও ধোয়াটে লাগলেও পদার্থবিদ ও দার্শনিকগন প্রভূত গবেষনা করেছেন বা আলোকপাতের চেস্টা করেছেন।তাই সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই ধরনের কাজ যথেষ্ট সাহসী ও বাহবা দেওয়ার মতোই।
আলোচ্য কবিতা-বই 'ব্যালেরিনা' এরকমই একটা উচ্চমার্গীয় কাজ,যা করেছেন কবি মহাদেব।গোটা বইটি মোট ৫-টি সিরিজ নিয়ে,শেষে একটি সোলো কবিতা রয়েছে - ছুটির ক্লোরোফিল।এই প্রতিটা সিরিজেই আমাদের মধ্যবর্তী চাওয়া,পাওয়া,কামনা, না ছোঁয়া,অসুখ,সুখ,প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে সেই (০ > ১) হয়ে।আর শেষে শূন্য থেকে শুরু হয় এক অদৃশ্য শূন্যগহ্বর।যেন কবি এক অদ্ভুত শূন্য কোলাজকে ফ্রেম বন্দীর খেলায় মেতে উঠেছেন।এই কাজ কতোটা প্রাসঙ্গিক বা আদৌ প্রাসঙ্গিক কিনা - দায়ভার অবশ্যই সময়ের উপর।একটা উদাহরন দিয়েই লেখাটি শেষ করতে চাই,যেটি বইটির সর্বপ্রথম লেখা :
"ভাবনাটা ধনাত্মক-ঋণাত্মক হতেই বুঝলাম
আজ বৃষ্টির নামে শিশির হতে চায় মেয়েটি
কেন হতে চায়-----এসব প্রশ্নের তোয়াক্কা না করে
এগিয়ে যেতেই
সমতুল্য ভগ্নাংশ থেকে অখন্ড রোদটি ছুয়ে
দিল-----বৃষ্টির পাপড় ভেজা রাত।"
(বইটি এবারে কলকাতা বইমেলা ২০১৭ তে প্রকাশিত।প্রকাশক : কবিতা পাক্ষিক)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন