আমাদের নব্বই,আমাদের হইচই
গণিতে কেন নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় না, এই প্রশ্ন ও সেই সংক্রান্ত রসিকতা আমরা শুনেছি। তবুও , কয়েকবার আমাদের চমকে উঠেছি যখন কোনো গণিতজ্ঞ এই পুরস্কার পেয়েছেন। যেমন ১৯৯৪, সে বছর অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন জন ন্যাশ, John Forbes Nash Jr. , তিনি তো অঙ্কেরই লোক, গেম থিওরিতে তাঁর অবদানের জন্য। সাথে John C. Harsany ও Reinhard Selten ।
যদিও অঙ্কবিদদের নোবেল পাওয়ার ইতিহাস একটু পুরোনো।
১৯৯৫০-এ সাহিত্যে Bertrand Russel ,১৯৫৪-এ পদার্থবিদ্যায় Max Born ও Walthe Bothe r , ১৯৭২-এ অর্থনীতিতে Kenneth Arrow । ন্যাশের পরেও গণিতের মানুষেরা নোবেল পেয়েছেন।
কিন্তু নোবেলের ইতিহাসে, মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ১৯৯৪-এর অর্থনীতির নোবেল। দেওয়া হয়েছিল কেন? "for their pioneering analysis of equilibria in the theory of non-cooperative games". মানে? Game? খেলার কথা? এখানে অঙ্ক কোথায় আর অর্থনীতিই বা কোথায়? কী সেই ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম ? in economics and game theory) a stable state of a system involving the interaction of different participants, in which no participant can gain by a unilateral change of strategy if the strategies of the others remain unchanged.। এমন একটা অবস্থা, যেখানে দুই বা তার বেশী খেলোয়াড় রয়েছে যে, একে অপরের স্থিতাবথার স্ট্র্যাটেজি জানে আর শুধুমাত্র নিজের স্ট্র্যাটেজি বদলিয়ে কোনো খেলোয়াড়েরই কোনো লাভ বা ক্ষতি হবে না। মানে, প্রতিপক্ষের সিধান্তের ওপরেও নির্ভর করে আমার সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা ।
ধরা যাক , ফুটবলে পেনাল্টি শটের সময়টা অথবা দাবার বোর্ডে মুখোমুখি দুই দাবাড়ু বা কোনো যুদ্ধের পরিস্থিতি, হ্যাঁ, এইসব প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহনে ও জয় পেতে কাজে লাগে গেম থিওরি। বা সেই বিখ্যাত prisoner’s dilemma, দুজন অপরাধী ধরা পড়েছে, কিন্তু যা প্রমান আছে তা দিয়ে তাদের যেটুকু কারাদন্ড দেওয়া যায় তা তাদের অপরাধের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু নতুন প্রমানও সংগ্রহ করাও যাচ্ছে না । তখন ওই দুজনের সামনে একটা প্রস্তাব রাখা হয়, মূল অপরাধের দায় অন্যার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার।
যদি দুজনেই অপরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে জেল হবে দুজনেরই দু বছর করে।
যদি একজন চুপ থাকে, কিন্তু তার সঙ্গী তাকে দোষী বলে, তো, যে চুপ তার তিন বছরের জেল আর যে বিশ্বাসঘাতকতা করল সে মুক্তি পাবে।
দুজনেই চুপ থাকলে দুজনেরই জেল হবে এক বছর করে।
এই রকম একটা পরিস্থিতি, আর নিজের লাভের জন্য পরিকল্পনা করা, অঙ্ক কষা, সমীকরণ বানানো।
বাস্তবের অন্য কোনো প্রতিযোগিতায় এর সূত্রগুলোকে ব্যবহার করা। যা মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি তৈরিতে দারুনভাবে কাজে লাগে, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অর্থনীতিতে ।
বহুমাত্রিক ও বহশর্তাধীন বাজার পরিস্থিতে লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণে গেম থিওরি ও ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের ভূমিকা নব্বই দশকে দারুণভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। আর তারই স্বীকৃতি ১৯৯৪-এর নোবেল পুরস্কার।
খেলার সাথে অঙ্ক, অঙ্কের সাথে বাণিজ্য মিশে যায় আর এক মাল্টিডিসিপ্লিনারি ডিসকোর্স তৈরি হয় সেই সময়ে।
ন্যাশের জীবনী নিয়ে ১৯৯৮-তে প্রকাশিত হল Sylvia Nasar-এর উপ্যনাস ‘A Beautiful Mind’ আর তা চলচিত্রায়িত হয় ২০০১-এ। পরিচালক Ron Howard এবং জন ন্যাশের ভুমিকায় অভিনয় করেন Russell Crowe , অস্কারের আসরে চারটি পুরস্কার জিতে নেয় সিনেমাটি।
খেলার সাথে অঙ্ক, অঙ্কের সাথে বাণিজ্য মিশে যায় আর এক মাল্টিডিসিপ্লিনারি ডিসকোর্স তৈরি হয় আমাদের নব্বইয়ে।
অঙ্ক, যার জন্য নোবেল প্রাইজ নেই, সেই অঙ্কের এক মগ্ন সাধক সেই দশকের নোবেলের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত হয়ে ওঠেন । খেলা আর শুধু খেলাটুকু থাকে না, বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে বানিজ্য।
বাঙালী জীবনে ফুটবল আর ক্রিকেট, এই খেলাদুটির অবস্থান ও ভূমিকা পাল্টে যায় সেই সময়।
‘বাঙালির প্রিয় খেলা ফুটবল’ এই মিথ ছিল শতাব্দীপ্রাচীন। স্বামী বিবেকানন্দের ফুটবল খেলার উপদেশ, মোহনবাগান ক্লাবের ১৯১১-য় শিল্ড জয়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ফুটবলের সদর্থক ভূমিকা খেলাটিকে বাঙ্গালিজীবনে প্রতিষ্ঠিত করে। সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় বাংলা ও বাংলার ক্লাবগুলোর প্রাধ্যান্য ছিল নিরঙ্কুশ। কিন্তু তা আশির দশক পর্যন্ত।
সন্তোষ ট্রফি শুরু হয় ১৯৪১ সালে। ১৯৮৯ পর্যন্ত বাংলা চ্যাম্পিয়ান হয় ২৩ বার এবং ১৯৭১ থেকে ৮৯ পর্যন্ত ১১ বার। তারপর নব্বই দশকে ৬ বার। কিন্তু ২০০০ থেকে এখনো অব্দি মাত্র দুবার।
ক্লাবস্তরের সরবভারতীয় প্রতিযোগিতা ফেডারেশন কাপ শুরু হয় ১৯৭৭-৭৮ সিজিনে। ১৯৮৯ পর্যন্ত কলকাতার ক্লাব মোহনবাগান চ্যাম্পিয়ান ৬ বার ( ২ বার যুগ্ম বিজয়ী) , ইস্টবেঙ্গল ৩ বার ( ২ বার যুগ্ম বিজয়ী), মহামেডান স্পোর্টিং ২ বার। নব্বই দশকে মোহনবাগান ৪ বার,ইস্টবেঙ্গল ১ বার, ২০০০ থেকে এখনো অব্দি মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল ৪ বার করে। জাতীয় ফুটবল লীগ শুরু হয় ১৯৯৬-৯৭য়ে। ২০০৬-০৭ অব্দি মোহনবাগান জিতেছে ৩ বার আর ইস্টবেঙ্গল ৩ বার,। ২০০৭-০৮ থেকে শুরু আই লীগ কলকাতার ক্লাবগুলির মধ্যে এখনও অব্দি একবার মাত্র মোহনবাগান চ্যাম্পিয়ান হয় ২০১৪-১৫ সিজিনে।
ক্লাবস্তরে কিছু সাফল্য থাকলেও বাংলার ফুটবল তার গৌরবময় অতীত থেকে চ্যুত। কলকাতা ফুটবল লীগ তার আকর্ষণ হারিয়েছে আর আই, এফ, এ শিল্ড এখন নিতান্তই বয়স ভিত্তিক একটি টুর্নামেন্ট। ফুটবল নিয়ে বাঙালির সে উন্মাদনা আর নেই। গ্রাম বাংলার মাঠে মাঠে ক্রিকেট অনেকটাই জয়গা করে নিয়েছে। কজন বাঙালি তরুন আজ ফুটবলার হওয়ার কথা ভাবে? অথচ বাঙালি দুই সেরা স্পোর্টস আইকন সৌরভ গাঙ্গুলি ও লিয়েন্ডার পেজ ফুটবলারই হতে চাইতেন ছোটবেলায়। ফুটবলের প্রতি বাঙালির আগ্রহ শেষ বারের মতো জাগিয়ে তোলেন অমল দত্ত ১৯৯৭-এ, তাঁর ডায়ম্নড সিস্টেম নিয়ে কথাবার্তায়। সে বছর তিনি মোহনবাগানের কোচ। মিডিয়া হাইপ ছিল এতটাই ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালে মোহন-ইস্ট ম্যাচ দেখতে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে জড়ো হয়েছিলেন ১৩১০০০ দর্শক। সেদিন ইস্টবেঙ্গল জেতে ৪-১ গোলে।
ফুটবল উন্মাদনা কমে আসে, তারপর আরও দ্রুত।
ক্রিকেট। হ্যাঁ, আমাদের সমাজজীবনে, কালচারে তার প্রভাব বিস্তৃত হতে থাকে।
১৯৯০-এর ২৩ থেকে ২৮শে মার্চ, ইডেনে রঞ্জিট্রফির ফাইনাল। দিল্লিকে উইকেট পিছু রানের গড়ে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ান হয় বাংলা। ১৯৩৮-৩৯-এর পর এই দ্বিতীয় বার। সেই ম্যাচেই অভিষেক হয় এক বাঁহাতি ব্যাটসম্যান আর ডানহাতি মিডিয়াম পেসারের, বাঙালির খেলাধুলা নিয়ে আবেগ আবর্তিত হবে তাঁকে কেন্দ্র করেই। ১৯৯২-এর ১১ই জানুয়ারি ভারতের হয়ে তাঁর প্রথম একদিনের ম্যাচ আর ১৯৯৬-এর ২০শে জুন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লর্ডসে জীবনের প্রথম টেস্টে ১৩১ রানের ইনিংস দিয়ে শুরু করবেন তিনি, পরের ম্যাচে টেন্টব্রিজে ১৩৬। তারপর আভিজাত্যে, আগ্রাসী মেজাজে, লড়াকু মানসিকতায় আমাদের একান্ত ‘দাদা’ শুধু এই বাইশ গজের খেলাটিতেই নয়, জীবনবোধেও হয়ে ওঠেন আমাদের অধিনায়ক। তাঁর কভার ড্রাইভ আর বাউন্সারে পড়ে যাওয়া যেন আমাদের উত্থান পতনের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর টিম থেকে বাদ যাওয়া ও ফিরে আসা মিশে যায় আমাদের যাপনে ।
১৯৯০ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেট দলে সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলা থেকে মাত্র ১২ জন(৫৮ বছরে, ভারত প্রথম টেস্ট খেলে ১৯৩২-এ) এরমধ্যে গোপাল বসু একটি বেসরকারী টেস্টে ও একটি ওয়ান ডে-তে। বাকিরা সবাই টেস্ট খেলেছেন। আর ১৯৯০ থেকে এখনও অব্দি ১৫ জন (২৭ বছরে)। সৌরভের আগে সবাইয়ের খেলা টেস্ট ম্যাচের যোগফল ১২৬ আর সৌরভ একাই খেলেছেন ১১৩টি টেস্ট।
ফুটবল থেকে ক্রিকেটের প্রতি এই যে আকর্ষণ বদলে যাওয়ার পেছনে একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে টেলিভিশনের। একমাত্র দূরদর্শন চ্যানেল, ছাদে ছাদে অ্যান্টেনার দিন পেরিয়ে আমরা কেবল টিভির দুনিয়ার প্রবেশ করি।
আর বলা হয় যে, যেহেতু ক্রিকেটে ওভারের ফাঁকে ফাঁকে আর উইকেট পড়লে বিজ্ঞাপন দেখানো সম্ভব তাই টেলিমিডিয়ার কাছে অন্য খেলাগুলোর চেয়ে ক্রিকেটের কদর বেশি ।
টেলিভিশন আর বিজ্ঞাপন , নব্বইয়ের সামগ্রিকতায এই দুটির প্রভাব সব চেয়ে গভীর। যে কোনো কোণ থেকে এই দশককে দেখতে শুরু করলে এই দুই মাধ্যমের কথা উথবেই।
তা পরের পর্বে ।
(ক্রমশ)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন