সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গদ্য কবিতা : স্বর্ভানু সান্যাল

দহন


আগুন লেগেছে বনে বনে। আগুন লেগেছে মৌটুসিটার ওম ভরা বুকে। পুড়ছে বুঝি, পুড়ছে বুঝি পুড়ে যাওয়ার সুখে। আগুন লেগেছে তার মনে। আজ আগুন লেগেছে ফাল্গুনে। আগুনে ঝলসাচ্ছে প্রাচীন সমাধি ক্ষেত্র। পথিক এসেছে একা। একমাত্র। আগুনে পুড়ছে সমাধির জঠর থেকে উঠে আসা প্রেতাত্মারা। আগুন সর্বত্র। তোমার ভিটেমাটিতে আগুন। তোমার বারান্দায় নুয়ে থাকা তেঁতুল গাছটায় আগুন। আগুনে পুড়ছে সুগভীর গিরিখাত। আগুনে পুড়ছে নায়াগ্রা জলপ্রপাত। আগুন লেগেছে গোপন সুড়ঙ্গে নির্বাসিত অন্ধকারে। আগুন পেটে নিয়ে জ্বলছে, নিভছে, মরছে জোনাকিরা বারে বারে। একটা প্রকাণ্ড, প্রকাণ্ড খাঁচায় বন্দি আমি। এত প্রকাণ্ড খাঁচা যে ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি আমার অন্তর্যামী। খাঁচাটাতে আগুন লেগেছে। হায়নার গায়ে আগুন লেগেছে। আয়নার গায়ে আগুন লেগেছে। পোষা ময়নাটার গায়েও আগুন লেগেছে। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখেও আগুন লেগেছে। বৃষ্টি-কণাদের মিষ্টি পরশ সুখেও আগুন লেগেছে। মা-মাটি-মানুষ জুড়ে আগুন লেগেছে। ফল-ফুল-ফানুষ জুড়ে আগুন লেগেছে। নদীর চরে, নদীর জলে, নদীতে ভাসা ভেলায় আগুন লেগেছে। আঁতুর ঘরে, খেত-খামার-গোলায় আগুন লেগেছে। মাতৃ জঠরে আগুন লেগেছে। বৃদ্ধ বট-বৃক্ষের কোঠরে আগুন লেগেছে। অন্তরীক্ষে আগুন লেগেছে। দেবদারু বৃক্ষে আগুন লেগেছে। আগুন জামা পরে বালক নচিকেতা দাড়িয়ে আছে। যমলোকেও আগুন লেগেছে। আগুন-শাড়ি পরে ঘুপচি গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ঐ যে কিশোরী আগুনে পোড়ে। আগুন-শরীর নিয়ে একটা গঙ্গা ফড়িং তার শরীর জুড়ে ঘোরে। তোমার আগুন-জংঘা আমায় পেতে চায়। তোমার মাথায় লাল অগ্নি-বলয়। আগুন লেগেছে স্নায়ুকোষ গুলোয়। আমার আগুন সর্প তোমায় দংশায়। নির্দ্বিধায়। তোমার শরীরে বীণার তারের অনুরণন। আমার আগুনে পুড়ছে তোমার আগুন মন। আকাশ থেকে টুপটুপিয়ে ঝরে পড়ছে নরম আগুনের গোলা। আজকে বুঝি আমাদের আগুন-হ্রদে ডোবার পালা। আমার আগুন-হাতে তোমার আগুন হাত। আজকের আগুন প্রাতে কালকের আগুন-রাত।

হঠাৎ আগুন গলে জল হয়ে গেল। সরযূ নদীর ধারা। জড়বৎ। মৃতবৎ শরীর। দূর কোন নক্ষত্র লোকের মৃত পাথর পারা।

জিজ্ঞাসা

আমার শরীর জুড়ে আজ তৈলাক্ত পিচ্ছিল অন্ধকার। দুরে কোথাও কে যেন ডাকছে আমাকে স্নেহ ভরা কণ্ঠে - বার বার। চেনা চেনা। অচেনা। ঝিঁঝিঁ পোকার মতো একটা অবিচ্ছিন্ন উমমমমমম্  ধ্বনি - বেজে চলেছে একটানা। আর কোথায় যেন হাপর পড়ে। লাব ডুব লাব ডুব লাব ডুব। চুপ, চুপ, চুপ। আবার যেন শুনি। শুনতে পাই সেই মধুস্বর। কোথায় দরজা? কোথায় দরজা তোমার, ওগো অন্ধ ঘর? সাড়া দিতে ইচ্ছে যায়। কিন্তু আমি ডুবে আছি এক জলজ সান্দ্রতায় - হায়, যেন এক নিশ্ছিদ্র শব্দহীনতায়। কোথায়? কোথায় আলোর আকর? হাতড়াই বার বার। চামড়ার ওয়ালপেপার। এখানে আমি - শুধু আমি আর গলা-নীলরঙা এই প্রহর। এখানে উষ্ণ, পিচ্ছিল অন্ধকার দিনভর। আমি অভিকর্ষহীনতায় ভেসে ভীষণ জ্বরে।  খিদে, আমার খিদে পেয়েছে ভীষণ জোরে। খাবার আসে রক্তে সরাসরি। মুখ নাড়াতে হয় না একেবারে। এবার তবে ভরা পেটে ঘুমিয়ে পড়ি নাকি? না না না না। আমার সাথে রোজ রোজ চলবে না চালাকি। আলো আমায় পেতেই হবে। আলো আমার চাই। এই আদ্র অন্ধকার থেকে মুক্তি আমার চাই। প্রাণপণে চেঁচাই। সজোরে লাথি কষাই স্থিতিস্থাপক চামড়ার দেওয়ালে। কে? কে ওপারে হাত খানি ছোঁয়ালে? সেই চিনিঢালা, সেই মধুভরা ডাক। আমি অবাক, নির্বাক। কে ও? ওখানে? আমায় টানে। আমায় চায়। আমায় এত ডাকে। তবে কোন উদ্দেশে দূরে দূরে থাকে? কোন উদ্দেশে চামড়া ব্যাগে আমায় বন্দি রাখে? নাহ্, জানতে আমায় হবেই। আলোকধারায় নাইতে আমায় হবেই। ওই অচেনা, চেনা-চেনা, অর্ধ-চেনা মানুষটাকে চিনতে আমায় হবেই। আবার - প্রাণপণে হাতড়াই আবার। বারবার। যদি কোনো পথ খুঁজে পাই। লাব ডুব লাব ডুব লাব ডুব। চুপ, চুপ, এই চুপ। পেয়েছি। পেয়েছি একটা পথসন্ধান - একটা গলি। ভীষণ সরু, ভীষণ সরু গলি। হাত পা অসার, মাথা দিয়ে ঠেলে ঠেলে গলি বেয়ে চলি। পারবো আমি,  পারবো আমি - পারতে আমায় হবেই। আমার ধারণা এই পথের শেষ অতুল আলোক-বৈভবেই। প্রাণপণে মাথা দিয়ে খুঁড়ে চলি অন্ধকার গলি। এই গলি কি অন্ধ গলি, এর কি শেষ নেই - আমার চেষ্টা ব্যর্থ হবে খালি?

হঠাৎ। হঠাৎ শানিত তলোয়ারের থেকে ছিট্‌কে পড়া, অন্ধ করা আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ঝাঁঝালো একটা বিচ্ছেদ যন্ত্রণা আমায় খানা খানা করে দিল। শেষ হল খোঁজা। ভারী, ভীষণ ভারী এই হঠাত-জানার বোঝা।  সেই ভারের তীব্র ব্যাথায় চেঁচিয়ে কেদে উঠি। আমার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে ক্লান্ত হাসি মুখটি।


শব্দের খোঁজ


সূর্যের চোখ এখন ঢুলুঢুলু - আলস্যের আড়ালে ম্লান। পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে যত দুঃখ, যত কষ্ট, যত বিষাদভরা ব্যর্থ প্রেমগাথা আছে, সব কে যেন ছড়িয়ে দিয়েছে সবুজ ঘাসের ওপর এই হেমন্তের একলা দুপুরে। সব মিলে একটা কেমন কুয়াশার মত হয়েছে। চোখ চলে না যেন। মন চলে শুধু। চলতেই থাকে। রেললাইনের পাড় ধরে, টিলা, ধানক্ষেত, খাল, বিল ফেলে, পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে কোন অজানা অচিনপুরে। কোথাও কোন মানুষ-জন নেই। কোথাও কোন শব্দ নেই। এ কোন রাজ্য? রাস্তা ঘাট, আলো, বাড়ী সবই আছে। কিন্তু শব্দ নেই। চোখে  শূন্য দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে দুপুর। একলা দুপুর। মুখে বট ফলের ম্লান বিষণ্ণতা। শব্দের লোভে ঘুরছি আমি। শব্দ যোগাযোগের সুত্র - মানুষের সঙ্গে মানুষের, পাখির সাথে পাখির, মানুষের সাথে পাখির-ও কি? শব্দ যোগাযোগের সুত্র - আমার সঙ্গে তার। শব্দের একটা রঙ আছে - একটা কাচের বোতলে ভাগিরথীর জল ভরে আনলে তার যে রকম ঘোলা রঙ হয় সেই রকম। আমি দেখতে পাই। সেই রংটার আঁচড় দেখছি না কোথাও। কোন দুষ্টু এসে ধুয়ে দিয়ে গেল বুঝি, নাকি আমি রঙ দেখতে ভুলে গেছি? আমি প্রানপনে খুঁজি। খুঁজতে খুঁজতে পাই সেই রাজবাড়িটা। ওই শ্রদ্ধাবনত অশ্বত্থ গাছটা শব্দহীন ভাষায় জানিয়ে দিল, তাই বুঝলাম - ওটা রাজবাড়ি। নয়ত ওই বুঝি রাজবাড়ি? ইট বিবর্ণ, শ্যাওলা পড়া, কোথাও কেউ নেই। ছিঃ। কিন্তু আমি নিরুপায়। শব্দের খোঁজে ঢুকে পড়ি রাজবাড়িতে। শব্দ যে আমায় পেতেই হবে। আমি পৃথিবীর কারো সাথে কখনো যোগাযোগ করিনি। শব্দ নেই বলে। সূর্য যেমন আলো দেয়, আমি তেমন জল দিতে চাই। শব্দ-জল। আমার মধ্যে শব্দ-সাগর আছে। তার থেকে কিছুটা। কিছুটা কেন, সবটা। নিজেকে উজাড় করে দিতে চাই, যেমন দধীচি দেয়। আমি কি আজকের সূর্যটার মত কৃপন নাকি? পাজিটাকে দেখো। এতো আছে, তবু দিচ্ছে কম। মাপজোক করে, হিসেব করে, একটুখানি আলো - যেন এই বুঝি ফুরোবে। আমি অমন নই। আমি সবাইকে ভিজিয়ে দিতে চাই। সবাইকে ইলশে-গুড়ি শব্দ বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিতে চাই।
শব্দের খোঁজে আমি রাজবাড়িতে ঘরের পর ঘর, ঠাকুরদালান, শোবার ঘর, রান্নাঘর, বৈঠকখানা সব ঘুরে ফেললাম। নাঃ কোথাও নেই এতটুকু শব্দ। সব রঙ আছে, কিন্তু ওই ঘোলা রংটা নেই কোথাও।

খুঁজতে খুঁজতে আমি চিলেকোঠায়। এখন শুনতে পাচ্ছি আমি। শব্দ। না, না শব্দ না। ধ্বনি। গান। ধ্রুপদি সঙ্গীতের মিড়।, তানপুরার ছড়। একটা মেয়ে - রাজকন্যা কি? হয়তো বা। ওর দুই দীর্ঘ আনত নয়নে পদ্ম ফুল। ওর উপস্থিতি ক্ষীণ ফল্গু ধারার মত দু দন্ড শান্তির অবসর। আমায় দেখেই ওর চোখ পদ্ম পাতার মত ভারী। বিস্মিত হল না, চঞ্চল হল না আঁখি। যেন কতকাল ধরেই জানত আমি আসব, এই শব্দহীন দুপুরে শব্দের সন্ধানে আমার এই আসা এ যেন কতকাল আগে থেকে বিধাতার অনিবার্য লেখনিতে লেখা হয়ে আছে। আমার মনে হল সব্বাই - এই রাজবাড়ি, এই অশ্বত্থ গাছ, ওই কিপটে সূর্য, সব্বাই জানত আজ এই মুহুর্তে আমি এখানে আসব।

আমার চোখে জল। সারা জীবন ধরে আমার যে শব্দের খোঁজ সে শব্দ এখন আমার সামনে। আমি দেখতে পাচ্ছি। শব্দকে কি দেখা যায়? আমি দেখতে পাই, ওই ঘোলা রংটা। আমি দেখতে পাচ্ছি ঘরটা কেমন শব্দে টইটুম্বুর। আমি বুঝতে পারছি শব্দের পাত্তা নেই কেন আর কোন খানে। সব...সব শব্দই যে শুষে নিয়েছে এই চিলেকোঠার ঘরটা। ওই রাজকন্যার গলা থেকে বেরন প্রতিটা সুর, প্রতিটা শব্দ এত সান্দ্র যে এই চিলেকোঠার ঘর থেকে বেরতে পারেনি। কোন বিস্মৃত অতীত থেকে ও গান গেয়ে চলেছে। ব্রম্ভান্ডের আদিতে যে শব্দ, অনাদি যে শব্দ, অনুচ্চারিত যে শব্দ, অনাহত শব্দ। শব্দের টানে শব্দ বেরোতে পারেনি এ ঘর থেকে। ছড়িয়ে পড়তে পারেনি বিশ্বময়। সবটুকু ওখানেই জমা হয়ে আছে। প্রতিটি সেকেন্ডে বেরোন শব্দ, প্রতিটি মিলি সেকেন্ড, মাইক্রো সেকেন্ড, ন্যানো সেকেন্ডে বেরোন শব্দ জমা হয়েছে প্রতিটি মিনিট ধরে, দিন ধরে, বছর ধরে, শতাব্দী ধরে, যুগ ধরে। সে যে কত গাঢ় শব্দের কুয়াশা সে আমি বোঝাতে পারব না। - আমি দাঁড়িয়ে আছি তার মধ্যে। ওই গাঢ় কুয়াশার মধ্যে আমি হারিয়ে যাচ্ছি, হারিয়ে যেতে যেতে আনন্দ পাচ্ছি।

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কবিতা বিষয়ক গদ্য : অনিন্দ্য রায়

ন্যূনতম কবিতা lighght শুধুমাত্র এই সাতটি অক্ষর লেখার জন্য কবিকে দেওয়া হল ৭৫০ ডলার। আজ নয়, গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি। পৃথিবীর সব চে দামী শব্দ। আর বিতর্ক এখানেই। শব্দ? কী অর্থ এর? আবার যিনি লিখেলেন তিনি তো একেই বলছেন কবিতা, এই কটি অক্ষরসমষ্টিকে। তা প্রকাশিতও হচ্ছে, সংকলনে নির্বাচিত হচ্ছে। একটা সাদাপৃষ্ঠার মাঝখানে lighght এইটুকু ছাপা, এইটুকুই, একে বলে কবিতা ? ম্যানহাটন শহরে তখন শরৎকাল।  সালটা ১৯৬৫। সে এক সন্ধ্যা। বছর  বাইশের এক যুবক নিজের টাইপ রাইটারে  lighght এইটুকুই টাইপ করেন। কী এটা? বানান ভুল, হ্যাঁ,  light  শব্দটির মাঝে এই দুটি ব্যঞ্জনবর্ণকে ঢুকিয়ে দেওয়া, আর তাতেই নাকি  ব্যঞ্জনা । শিকাগো রিভিউ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবিতা হিসেবে। এবং তা স্থান পায় The American Literary Anthology-র দ্বিতীয় খণ্ডে, অবশ্যই কবিতা হিসেবে। এই সংকলন সম্পাদনা করেন National Endowment of the Arts(NEA) –এর পক্ষে George Plimpton। NBA-এর সিদ্ধান্ত মতো সংকলনটির প্রত্যেক কবিই পান ৭৫০ ডলার। সেই হিসেবে lighght-এর রচিয়তাও।  শিকাগো রিভিউ নিজে২৫০ ডলার রেখে দেয় আর বকিটা পেলেন কবি। ম...

পাগল পাঠক (কবিতার পাগলামি)

কবিতার তুমুল পাগলামি কাকে বলে সেটা অনেকেই জানেন। তবুও কবিতার সীমাহীন পাগলামির জন্য কবিতার সমস্ত পাগলরা ফেসবুক বা মুখবই এ সার্চ করুন "পাগল পাঠক" পেজটি। এই পেজটি পাগল কবিতা পাঠকের নিজস্ব দুনিয়া। বন্ধুরা যারা পেজটি লাইক করছেন তারা নিজের প্রিয় কবিদের কবিতা পোস্ট করুন। অনুরোধ নিজের কবিতা পোস্ট করবেন না। বিস্তারিত জানতে ফেসবুকে পেজে আমাদের পেজে যান।

গদ্য কবিতা : সুকান্ত দে

ডাব তুই হয়তো বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছিস। চুপিচুপি একটু গা ঘেষে দাঁড়াই। যাতে তুই একটু ঠেস দিতে পারিস। তোর ফাইল ব্যাগ একটু ধরি। তুই বলবি -- আ : হাত দুটো একটু ছড়াই, বলে সত্যিই ছড়িয়ে ...