সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ধারাবাহিক গদ্য (পর্ব - ৪) : অনিন্দ্য রায়

আমাদের নব্বই, আমাদের হইচই




নব্বইয়ের শুরুতে, তখন বেশ জনপ্রিয় হয়েছে ক্যুইজ, সিদ্ধার্থ বসুর প্রভাবে হয়ত। আর যে বেশিরভাগ ক্যুইজ অনুষ্ঠানেই একটা প্রশ্ন ছিল কমন, যার উত্তর হত, রীতা ফারিয়া। হ্যাঁ, বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী একমাত্র ভারতীয়র নাম। ১৯৬৬ সালে তিনি মিস ওয়ার্ল্ড নির্বাচিত হন। কিন্তু নব্বই দশকে ব্যাপারটাই যেন অন্যরকম হয়ে গেল।

১৯৯৪-তে মিস উইনিভার্স খেতাব জয়ী হন সুস্মিতা সেন এবং সেই বছরই ঐশ্বযা রাই হন মিস ওয়ার্ল্ড। তারপর ডায়না হেডেন (১৯৯৭), যুক্তা মুখী ( ১৯৯৯) , প্রিয়াঙ্কা চোপড়া (২০০০) মিস ওয়ার্ল্ড এবং লারা দত্ত (২০০০)মিস উইনিভার্সের মুকুট মাথায় পরেন। ২০০০-এই মিস এশিয়া প্যাসিফিক হন দিয়া মির্জা (১৯৭০-এ এই খেতাব পেয়েছিলেন জিনাত আমন)।  তাছাড়াও বিভিন্ন সুন্দরী প্রতিযোগিতায় ভারতীয়দের দাপট ছিল সেই দশকের নজরে পড়ার মতো ঘটনা।

সমাজের এক স্তরের কাছে মডেলিং একটি পেশা হিসেবে, সমস্ত গ্ল্যামার উপাদান নিয়েই প্রতিভাত হয়। মিলিন্দ সুমন বা পোস্টার শোভা পেতে থাকে সেই প্রজন্মের তরুণ তরুণীদের বেডরুমের দেওয়ালে। এবং এই মডেলদের যে কাজের ক্ষেত্র, বিজ্ঞাপনের দুনিয়া, ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯- এই দশ বছরে, বাজার অর্থনীতির বিকাশের সাথেসাথেই  বিজ্ঞাপনের বাজার কয়েক হাজার গুণ বিস্তৃতি লাভ করে। দুই ঠাণ্ডাপানীয় কম্পানির মধ্যের বিজ্ঞাপনী লড়াই, ভোজ্য তেল ধার-ই হোক বা কাপড়কাচার ডিটারজেন্ট-সৃজনশীল বিজ্ঞাপন উপাস্থাপনা, ছাপা হোক বা অডিও-ভিস্যুয়াল মাধ্যম আমাদের সংস্কৃতিতে ক্রেতাকে প্রভাবিত ও প্রলুব্ধ করতে নিজের ভূমিকায়  বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠে নিজেই একটি কাল্ট, একটি সংস্কৃতি।

বাজার ও বিপণন হয়ে ওঠে সমগ্রজাতির নিয়ন্ত্রক । ১৯৯১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন পি ভি নরসিমা রাও, আর অর্থমন্ত্রী হন ডঃ মনমোহন সিং। সেই বছরই আর্থিক-সামাজিক সংস্কারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সরকার। অর্থনৈতিক উদারীকরণের মধ্যে দিয়ে নতুন যুগের শুরু হয়। বিদেশী পুঁজিকে আহ্বান, বেসরকারী ক্ষেত্রকে উৎসাহ, সরকারী নিয়ন্ত্রণের শিথিলীকরণ, তথাকথিত ‘লাইসেন্স রাজ’-এর বিলোপ – এইসব নানান উদ্যোগ ভারতীয় সমাজব্যবস্থার মূল নাড়িয়ে দেয়। শুরু হয় পেপ্সি-কোকাকোলার যুগ। বিশ্ববাণিজ্যের মানচিত্রে ভারত এক বিশাল বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বলিউডের সিনেমা বিদেসী তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত করে আর বহুজাতিক কোম্পানিরা তাদের পণ্য, ভোগ্যপণ্যের সম্ভার মেলে ধরে ভারতীয় বাজারে।

  কেউ কেউ বলেন, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় ভারতীয়দের সাফল্যের ব্যখ্যা লুকিয়ে আছে এই ক্রমবর্ধমান ভারতীয় বাজারের স্বার্থসিদ্ধির ভাবনার মধ্যে।

আর এই সবকিছুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায় একটা চারকোণা বাক্সে, যার নাম টেলিভিশন সেট।

সে ছিল একটা সময়। দেশে একটা মাত্র টেলিভিশন চ্যানেল, দূরদর্শন; ডি ডি ন্যাশানাল আর ডি ডি মেট্রো। ছাদে অ্যান্টেনা আর ঝিলঝিলে ছবি। বুধবারের চিত্রহার আর রবিবারের ছায়াছবি, রামায়ন মহাভারতের চিত্রায়ন, হামলোগ-বুনিয়াদ-ওয়াগলে কে দুনিয়া,  ভারত পাকিস্থান ক্রিকেট ম্যাচ, শ্যারন প্রভাকরের বর্ষবরণ।

সরকারের উদার অর্থনীতির আবহে বদলে গেল পুরো দৃশ্যপট। ভারতীয় বেসরকরি টিভি চ্যানেল হিসেবে নব্বইয়ের দশকে আত্মপ্রকাশ করল Zee TV, E TV, Sun TV আর STAR TV, CNN –এর মতো বিদেশী চ্যানেলগুলির সম্প্রচার শুরু হল এদেশে। টিভির দাম হল সাধারণের ক্রম ক্ষমতার নাগালে। বিক্রি বাড়ল, উপভোক্তা বাড়ল, বাড়ল বাজারও, সব অর্থে, সর্বাত্মক।

এল স্যাটেলাইট আর কেবল টিভি। হাতের মুঠোয় ধরা রিমোর্টে একের পর এক চ্যানেল বদলে, এই পছন্দ থেকে অন্য পছন্দে মুহুর্তে চলে যাওয়ার সুযোগ এল আমাদের সামনে।

গানের ভাষায় ধরা রইল সে কথা,
                পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে,
                স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে,
                ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী...

                ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে,
                যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে,
                ঘুচে গেছে বেশ কাল সীমানার গন্ডি...
  ছোট হয়ে এল পৃথিবীটা, মুঠোর মধ্যে। একটা গ্রামের মতো। গ্লোবালাইজেশনের হাওয়া বইল সারা দেশ জুড়ে, সারা পৃথিবী জুড়ে।

    আমাদের বেঁচে থকায়  আরেক বাস্তবতা যোগ হল, টিভির বাস্তবতা।

   ভারতীয় সমাজজীবনে টেলিভিশনের প্রভাব, বাজার অর্থনীতির সাথে তার যোগ নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন ঘটনা। এর সাথে মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানির এই বাজারে প্রবেশ, বিদেশী পুঁজির প্রয়োগ, ভোগ্যপণ্যের সহজলভ্যতা, ক্রয়ক্ষমতার আপাত বৃদ্ধি আমাদের কনজিউমার সোসাইটির বাসিন্দা করে ফেলে।

  বদলে যায় আমাদের আকাঙ্ক্ষা-চাহিদার সংজ্ঞা, চাওয়া-পাওয়ার হিসেব এক বহুমাত্রিক সমীকরণে নতুন করে  বিন্যস্ত হতে থাকে।

ভেঙে যায় শতাব্দীপ্রাচীন মূল্যবোধ, সমাজিক কাঠামো এবং কৌমচেতনাও বদলে যায়।

  এই বদলটাই নব্বই, এই দশটা বছর যেভাবে বদলেছে আমাদের তা হয়নি পাঁচহাজার বছরের মানবসভ্যাতায়।
  আমাদের সবকিছুই যেন নির্দেশিত হতে থাকে, ওই দশকের সূচনায় প্রথম বিজ্ঞাপনেই পেপসি তা জানিয়ে দেয় এটুকু বলে , ‘এহি হ্যায় রাইট চয়েস, বেবি’।

  এই চয়েস ও তার নিয়ন্ত্রণ, এবং এর ভেতরের রাজনীতি, দ্বন্দ্ব, আত্মসমর্পণ ও অস্বীকার – এই নিয়েই আমাদের নব্বই, এই নিয়েই আমাদের হইচই ।
 
(ক্রমশ)

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কবিতা বিষয়ক গদ্য : অনিন্দ্য রায়

ন্যূনতম কবিতা lighght শুধুমাত্র এই সাতটি অক্ষর লেখার জন্য কবিকে দেওয়া হল ৭৫০ ডলার। আজ নয়, গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি। পৃথিবীর সব চে দামী শব্দ। আর বিতর্ক এখানেই। শব্দ? কী অর্থ এর? আবার যিনি লিখেলেন তিনি তো একেই বলছেন কবিতা, এই কটি অক্ষরসমষ্টিকে। তা প্রকাশিতও হচ্ছে, সংকলনে নির্বাচিত হচ্ছে। একটা সাদাপৃষ্ঠার মাঝখানে lighght এইটুকু ছাপা, এইটুকুই, একে বলে কবিতা ? ম্যানহাটন শহরে তখন শরৎকাল।  সালটা ১৯৬৫। সে এক সন্ধ্যা। বছর  বাইশের এক যুবক নিজের টাইপ রাইটারে  lighght এইটুকুই টাইপ করেন। কী এটা? বানান ভুল, হ্যাঁ,  light  শব্দটির মাঝে এই দুটি ব্যঞ্জনবর্ণকে ঢুকিয়ে দেওয়া, আর তাতেই নাকি  ব্যঞ্জনা । শিকাগো রিভিউ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবিতা হিসেবে। এবং তা স্থান পায় The American Literary Anthology-র দ্বিতীয় খণ্ডে, অবশ্যই কবিতা হিসেবে। এই সংকলন সম্পাদনা করেন National Endowment of the Arts(NEA) –এর পক্ষে George Plimpton। NBA-এর সিদ্ধান্ত মতো সংকলনটির প্রত্যেক কবিই পান ৭৫০ ডলার। সেই হিসেবে lighght-এর রচিয়তাও।  শিকাগো রিভিউ নিজে২৫০ ডলার রেখে দেয় আর বকিটা পেলেন কবি। ম...

পাগল পাঠক (কবিতার পাগলামি)

কবিতার তুমুল পাগলামি কাকে বলে সেটা অনেকেই জানেন। তবুও কবিতার সীমাহীন পাগলামির জন্য কবিতার সমস্ত পাগলরা ফেসবুক বা মুখবই এ সার্চ করুন "পাগল পাঠক" পেজটি। এই পেজটি পাগল কবিতা পাঠকের নিজস্ব দুনিয়া। বন্ধুরা যারা পেজটি লাইক করছেন তারা নিজের প্রিয় কবিদের কবিতা পোস্ট করুন। অনুরোধ নিজের কবিতা পোস্ট করবেন না। বিস্তারিত জানতে ফেসবুকে পেজে আমাদের পেজে যান।

গদ্য কবিতা : সুকান্ত দে

ডাব তুই হয়তো বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছিস। চুপিচুপি একটু গা ঘেষে দাঁড়াই। যাতে তুই একটু ঠেস দিতে পারিস। তোর ফাইল ব্যাগ একটু ধরি। তুই বলবি -- আ : হাত দুটো একটু ছড়াই, বলে সত্যিই ছড়িয়ে ...