[এসংখ্যা থেকে শুরু হল প্রথম দশকের তরুন কবি শুভম চক্রবর্তী'র কলমে "ধারাবাহিক ব্যক্তিগত গদ্য"।এই সংখ্যায় নতুন ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব দেওয়া হল।]
পছন্দপুর
১
কে জন্মায়,হে বৈশাখ
"সকাল থেকেই লোকাল train-এর ভিড়ে কাটছে. . .অন্য অনেক অনেক দিনের মতো আজও . . .বুকে হাত দিয়ে বলছি-রাবীন্দ্রিক খুশবু নেই একটুও. . .বরঞ্চ পুরো trainটাই কেমন যেন -রাম-রাম মার্কা।বারোয়ারী ইউরিন্যালগুলোতে কি গন্ধ মাইরি . . .কোত্থাও রাবীন্দ্রিক খুশবু নেই। আজ হল সেই দিন, যে দিন একপাতাও রবীন্দ্রনাথ না পড়েই বলা যায়-- 'আহা গো কি ভালো ছিলেন গুরুদেব, সাক্ষাৎ ঠাকুর'।ঠাকুর বানানো এ দেশের চিরকালীন ঐতিহ্য ,এ দেশে-বুদ্ধ,চৈতন্য,রামকৃষ্ণ,বিবেকানন্দ ! সবাই ঠাকুর ! রবীন্দ্রনাথও !
আজ হলো সেই দিন, যেদিন--কাজ করা ,'ওরা' নয় সিরিয়ালমনস্কা ফর্সা হোমমেকারেরা তাদের না জানা না পড়া বিহ্বলতাকে নরম তুলতুলে ভঙ্গীতে তুলে ধরেন হলভরা শ্রোতা সামনে. . .আর দুমাদ্দুর হাত্তালি পড়ে. . . আর আরও একবার আমার পাড়া গাঁ-এর মৃণালেরা ভাত রাঁধে. .শুধুই ভাত রাঁধে. .আর ডাইনি সন্দেহে পুড়ে মরে প্রমাণ করে মরিনি রুকমনি মুর্মূ. . .আর তিনটে ছুরি চারটে পিস্তল .. .আর মুসলমানরা বড় বেড়ে গ্যাছে. . .আর হিন্দুরা শালা 'মালাউন' ! পরস্পর এতো ঘেন্না !!!. .. এই দেখুন না এতো কথা লিখতে গিয়েও এককামরা লোকের সামনেই কেঁদে ফেললাম. . .লজ্জ্বা হলো. . .একটু দূরের সিটে প্রেমিক-প্রেমিকাযুগল বসে আছে. . .আমায় দেখে তারা মৃদু হাসলো ! তাদের হাসির গন্ধের সঙ্গে খিলখিল করে উড়ে এলেন রবীন্দ্রনাথ. .এতো রক্ত এতো ঘেন্না চারদিকে. . .তবুও ওরা ভালোবাসে. . .ওরা কাজ করে. . .তাই তো তুমি আজও আছো দুখজাগানিয়া ঠাকুর. . .তাই তো আজ ২৫শে বৈশাখ. . ."
২
দারুণ প্রখর দিন
না, আজ সকাল থেকে কারও ফোন আসেনি। কারও মনে পড়েনি আমার কথা ,আমারও কাউকে মনে পড়েনি।শুধু একটা হাওয়া মুরাডি পাহাড়ের--বড়ন্তি ড্যাম্পের গা ছুঁয়ে এসে উস্কানি দিচ্ছে হু হু শূন্যতাকে।কানাই কাকার কোনো শূন্যতা নেই ! অথবা তার সমস্ত শূন্যতাই লাঙলের ফলায় ঝকঝক করে। এবছর সূর্য যেন দ্বিগুনভাবে ফুটছে ,কোনো মায়া নেই তার. . .রুখাশুখা মাটির বুকে নেই দুফোটা বৃষ্টির সোহাগ।থেকে থেকেই শূন্যতা উসকে উঠছে।রামনবমীর মিছিলে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের হাতেও অসত্র ঝকঝক করছিল, শুধুই মনোকষ্ট। কানাই কাকার এসব ভাবলে চলেনা ওর আছে বিস্তীর্ণ টাঁড়ভূমি আর মাটির ওপর শুয়ে পড়া আজন্মলালিত সবুজের হাতছানি । না, আজ সকাল থেকে কারও ফোন আসেনি ,এমনকি বান্ধবীদেরও না। এখন ছোটো ছোটো ঘটনায়-ঘটনাহীনতায় বড় অপরাধবোধ হয়,কখনও কখনও বুঝতেই পারিনা এতো অপরাধবোধ কিসের ?? অথবা বুঝেই ফেলি সমস্ত অপরাধবোধই আসলে দাদুর ভাঙা লাইকেলটার মতো যাকে কোনোদিন সারিয়ে তোলা যাবেনা।বৃষ্টির দেখা নেই,জানিনা কী আশায় কানাই কাকার কাঁধে লাঙল।যে লাঙলের ফলা রামনবমীর হিংস্র অসত্রের মতো নয় বরঞ্চ নামোপড়াডিহার সাঁওতাল মেয়েটির নিষ্পাপ খিলখিল হাসির মতো। তবুও এই শূন্যতামাখা হাওয়ার দাপটকে সরিয়ে একফালি রোদ আমাদের উঠোনে গড়াগড়ি খাচ্ছে. . .নয়নতারা ফুলের বনে ছুটে বেড়ায় লাজুক কাঠবেড়ালী. . .কানাইকাকার কাঁধে লাঙল !
একদিন অদেখা-অজানা সমস্ত অপরাধবোধ মাখামাখি হবে. . .একদিন শুকনো বাইদ-বহালে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদবো. . .কান্নায় সপসপ করবে জামা-প্যান্ট. . .দ্যাখো,কানাইকাকা,দ্যাখো আমরা হারিনি, শুষ্কতা-শূন্যতা থাকলেও আমাদের চোখের জলে ভিজে উঠেছে মাটি. . .দেখো এবার ঠিক ফসল হবে !
(ক্রমশ)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন