সম্পর্ক মণ্ডল : প্রথম দশকে যারা কবিতাচর্চায় প্রয়াসী হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক মণ্ডল একটি উজ্জ্বলতম নাম। "সম্পর্ক" নামটি শুনলেই মনে হবে একটি অমোঘ বৈষম্য চেতনার কথা। সম্পর্কের কবিতা প্রবল সম্ভাবনাময়ী। তাঁর কবিতা দূরদৃষ্টির অধিকারী। যাই হোক্ এবারের শূন্য তাপাঙ্কে "নির্বাচিত তরুণ কবি" হিসেবে আমরা সম্পর্ক মণ্ডলকে পেয়েছি। বলা বাহুল্য, সম্পর্ক মণ্ডল শূন্য তাপাঙ্ক অনলাইন এর যুগ্মসম্পাদক এবং "শূন্য তাপাঙ্ক" নামটি ওনারই দেওয়া। আশা করি সম্পর্কের কবিতায় বাংলা কবিতা পাঠক অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্কের বীজ খুঁজে পাবেন। লিখেছেন আস্তানাইয়া রুবাই।
সম্পর্ক মণ্ডল এর কবিতাগুচ্ছ
তোমার কবিতাকে
তোমার কবিতাকে ছুঁয়ে কিছু বলতে চেয়ে
নিজের কবিত্বকে দেখেছি
কত অর্থহীন বায়বীয় লাফ দিতে
দেখেছি বন্ধুদের ভিড়ে নেশাতুর অর্থযুক্ত কামড়ে
কত লোলুপ চাউনি আর
ব্যর্থ মাতালের স্বরূপটি নিয়ে
কত অবাক অভিযান
দেখেছি আগুনের পাশে গুম হয়ে থাকা
আগুনবিলাসী কত পাপ
আর মাঝরাতে আধঘুমে
তোমার শরীর ছুঁয়ে কিছু না বলেই
মাইরি
ঘুমিয়ে পড়েছি
***
শ্রাবনীর জন্য কবিতা
তুমি চলে গ্যাছো
তোমার পিছনে পিছনে চলে গ্যাছে পথ
আরও দূর পথে আরও দূরে
আম বাগান কেঁপে উঠছে বারবার
শুকিয়ে যাওয়া কাঁদর যেন
বিষন্ন বালিয়াড়ি
বালি উড়ছে তোমার নামে
সন্ধ্যার এক বুক অন্ধকার নিয়ে
হিম পড়ছে আম গাছ থেকে
বিষন্ন
তোমার নাম ধরে
***
নবান্নের আশ্চর্য ভোর
খেয়ালি বোষ্টমি আনন্দ ভৈরবী গাইবে বলে খঞ্জনিকে শুধায়---
হে অমর্ত্য তুমি পাখি হবে নাকি?
খঞ্জনিও তেমন চতুর। উত্তরে বলিল -- ডানার ঝাপটাটুকু শুধু
হৃদয়ে জাপটে ধরে থেকো।
খেয়ালি এবার গাইছে --'ওই যে রাই, মেঘের দুয়ারে...'
খঞ্জনিও উওরে উত্তরে ছটপট করছে শুধু।
এক সময় সমস্ত পথ শেষ হয়ে এলো। ভোরের চাদর খুলে নবারুণ
এসে দাঁড়ালো ওই।
খেয়ালি দেখছে -- মা অন্নপূর্ণা বামুন পুকুর থেকে স্নান করে এলো।
তার বাস্তুপতিকে চা করে দেবে বলে
নবারুণ চিমটি কাটলো জোর। রোদে। এক পাল সোনালি হাঁস উড়ে নামলো বামুন পুকুরের জলে।
খেয়ালির আনন্দ ভৈরবীর ফাঁকে ফাঁকে দুরন্ত খঞ্জনি আঘাতে
লাল মেঠো রাস্তা ধরে যে সকাল হল এই
গঙ্গাটিকুরির মাঠে। হিজল বনে বনে।
***
প্রথম দশকের কবিতা
তৈলমর্দনের দিন শেষ হয়ে এলো
এই কথা বলে একটি হরিয়াল পাখি
উড়ে গেলো অট্টহাসের বনে
আর এই শব্দ শোনা মাত্রই
গুটি কয়েক শেয়াল উঠলো ডেকে
যেন বাঘছাল পড়ে তাদের কৃতঘ্ন দিন
ফুরিয়ে এলো প্রায়
এই চিন্তায় তারা কলকাতার বনে বনে
ডেকে উঠলো তারস্বরে
--কি হবে গো আমাদের
--বাংলা কবিতা আমাদের বিনা ধবংস হবে কাল
আর তাদের সম্মুখের রাস্তায় একটি ভিড় বাস
কবি ও পাঠক- পাঠিকা বোঝাই করে
চলে গেলো ধর্মতলা থেকে মহাকবিতার দিকে
***
ছন্দব্যবসায়ী
আবার আসিবো ফিরে নম্র বাঘেরচামড়াধারী এক
ছন্দব্যবসায়ী হয়ে
আক্রোশে বাঘের গ্রন্থিছেদক প্রিয় নখ দিয়ে
চিরে চিরে দেখো নেবো
প্রিয়শোক
তোমার ভেতর কোনও প্রজাতির বিষ আছে কিনা
দু ফর্মার গেঁজে ওঠা পাপ
দু হাতে ধরে মাংসহীন ব্যক্তিগত স্নানে
আত্মহননের মতো অভ্যাসমুগ্ধের পাশে বসে
মিলিয়ে নেবো নীলমৃত্যু দিন
যা কিছু আর নাই নাই কোনও না-লেখা কাব্যগ্রন্থ থেকে
মেঘাবৃতলোকে উড়ে যাবো
আবার
ঘুমের ফেনায় ঢাকা স্বপ্নিল এক
মিথ্যাচারী ছন্দের ব্যাকুল ব্যবসায়ী হয়ে
***
আত্মশুদ্ধির পথে
ক্রমশ নি:শব্দের মধ্যে গোল হয়ে বসা প্রেম
ক্রমশ ফুর্তির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া গুটি
আমি খুঁজতে থাকি ভিড়ে
কখনও মানুষের মুখের আড়ালে
মাঝে মাঝে নিজের ভিতরে লাথি মেরে
বলে দিতে ইচ্ছা করে-
এই সম্পর্ক তুই ওঠ পালা
যেভাবে পাপ ঘাঁটি দু হাতে
যেভাবে স্বজ্ঞানে বিষাদ কুড়াই
মাঝে মাঝে নিজের ভিতরে লাথি মেরে
বলে দিতে ইচ্ছা করে-
সম্পর্ক তোকে জীবনেও ক্ষমা করবো না আর...
***
আবিষ্কার
সশব্দে ফেটে যাবো হঠাৎ
এমনকি ভেবেছি কখনও
রাস্তায় গুপ্তধন খুঁজতে গিয়ে
কি ভেবেছি কখনও
মারা পড়বো গুপ্তঘাতকের হাতে
মারা পড়ছি তো রোজ
ট্রেনে বাসে ট্রামে
গুপ্তবাণের আঘাতে
আর বারবার চোরাকুঠুরিতে নেমে
হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে
তুলে নিয়ে আসছি
আমার কিশোরকালের
প্রেমিক শবদেহ
***
লাবণ্য
যার জন্য একদা
কলেজ যেতাম
যার জন্য একদা
পাশাপাশি হাঁটতাম রোজ
পরশু হঠাৎ তাকে দেখলাম
ছেলেকে নিয়ে স্কুল থেকে
ফিরছে
বন্ধুদের কথার সাথে হুবুহু
মিলিয়ে দেখলাম
তার সব ঝুলে গ্যাছে
বিকালের পড়ন্ত পশ্চিমের রোদের
মতো উদাসি হয়ে
সে চলে গেলো সংসারমুখী
পিচরাস্তা ধরে
শুধু মনে হল
তার লাবণ্যটুকু
এখনও পড়ে রয়েছে কলেজের রাস্তায়
***
সাহিনা
সাহিনার নিথর দেহ পড়েছিল
নক্ষত্রের আগুনঝরা রাতে
কে তাকে ওভাবে গুলি করেছিল
কে তাকে শুইয়ে রেখেছিল
পাঁচিলের গায়ে
দু'হাত চেপে ধরে রক্তাক্ত বুকে
তার নিথর দেহ
কার দিকে চেয়েছিল অমন করে
রাতের ঠান্ডা শিশির তাদের
ক্ষমা করবে না
রাতের রূপালি আগুন তাদের
ক্ষমা চোখে দেখবে না
বর্ধমানের মাটি বর্ধমানের দেহাতি সবুজ ফসল
তাদের কখনও ক্ষমা করবে না আর
***
বিপ্লব
বিপ্লব তুমি কাদের ঘরে আছো?
এমন প্রশ্নে ক্লান্তি আসে
ভাবি কোথা গেলে বিপ্লব তোমাকে পাওয়া যাবে
এসো হে নবীন প্রেম
আমাদের উঠোনেতে বসো
আমাদের ঘরের শিশুর গর্তে চোখ নেই
মাছিমরা ভাত কাঁকড় মেশানো ডালে
এসো বিপ্লব
তোমায় কলমি শাক সিদ্ধ দিয়ে ভাত দেবো
লাল আবির ওড়াবো আজ
তোমার দরজায়
***
নবান্নের আশ্চর্য ভোর 💖
উত্তরমুছুনতোমার কবিতাকে ও শ্রাবণীর জন্য এক্সেলেন্ট।বাকিগুলোও বেশ।তবে ১ম দুটিকে ছাপিয়ে গিয়ে নয়।
উত্তরমুছুন