শূদ্রক উপাধ্যায় : শূন্য তাপাঙ্কের এ সংখ্যায় আমাদের "প্রিয় তরুণ কবি" হিসেবে পেয়েছি প্রথম দশকের তরুণ কবি শূদ্রক উপাধ্যায়। শূদ্রক এর নাম অনেকেই শুনে থাকবেন। ইনি "ইতিকথা এখন" নামে একটি মননশীল সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন। আর চুটিয়ে কবিতাও লেখেন। এই কবির কবিতায় সবসময় প্রেম ও প্রেমানন্দ জীবনের একটা অনবদ্য ছাপ লক্ষ্য করা যায়। কবিকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই। শূন্য তাপাঙ্ক এই কবির লেখায় ঋদ্ধ হবে। আশা পাঠক হিসেবে আপনারাও এই কবিকে স্বীকার করে নেবেন স্বছন্দে। লিখেছেন শুভদীপ সেনশর্মা।
শূদ্রক উপাধ্যায় এর কবিতাগুচ্ছ
ডায়েরি ও মুখোশ ১
প্রেমিকের পোশাক ছিঁড়ে শরীর বেরিয়ে এলে পড়ে থকে শূন্যতা ;
দেয়ালে দেয়ালে ঝুলে থাকা শৈশব স্বপ্নে মাঝে মাঝে ঢুকে পরে ।
ইথিওপিয়ান হ্রদ পার করলেই মনে পড়ে
কোথাও কোন খাবার রাখা ছিলনা যিশুর মৃত্যুর আগে ;
প্রেমিকার গুপ্ত খাতায় ...
শুধু গ্রামীণ খাতা জুড়ে শুকনো পাতার খস খস শব্দ আর
ভায়োলিন আঁকা থাকে ...
ডায়েরি ও মুখোশ ২
পাখি ওড়ার শব্দে কোন দিন ঢেউ ওঠেনি বন্দরে,
সমুদ্রগামী জাহাজ নদী ঘুরে গেলে ঢাকা পড়ে যায় শীতকালীন রৈখিক বুনন।
আরও আরও আরও যুবকের সমাবেশে একদিন সব ঘরবাড়ি উড়ে যাবে নোম্যানস ল্যান্ডে।
বন্দুক,
অগ্রহ্যতার ভান শিখে নিতে নিতে মানচিত্রের রেখা টেনে বড় করে,
পোষা ইঁদুরের পাল এই মাত্র আমাদের ফসল গর্তে লুকিয়ে নিলো।
আমি মরুভূমি থেকে বলতে পারি প্রতিটা শীতকালীন মুখ আসলে মুখোশ
টেলিভিশন হামাগুড়ি দেওয়া বেডরুমে।
পাশ্চাত্য অন্ধকারে প্রেমিকের ডায়েরি খুলে আমি এগিয়ে যাই আরও একটু... ইথিওপিয়ান হ্রদ।
ডায়েরি ও মুখোশ ৩
আরও আরও আরও কিছু সময় থেকে যেতে চাই
প্রেক্ষাগৃহের নীলাভ চেয়ারে পিঠ এলিয়ে,
পর্দা নড়ে চড়ে ওঠতেই আঙুল ঘন ঘন সুর তোলে আবার পাল্টায়,
থেমে যায় পিয়ানোর কি বোর্ডে...
ছায়ারা ভেসে এলে আরো জমে ওঠে পর্দা,
জমে ওঠে প্যালেস্টাইন কবি,
ইহুদি নাবিকের ছদ্মবেশে নাটকীয় ফিস ফিস্ ফিস ফিস্ ফিস ফিস্ ;
নিকোলাস আদ্রে কে বলা হয়নি ডায়েরিটা পাওয়া গেছে
ইথুওপিয়ান সভ্যতার খনন কার্যে...
প্রেমিকর হাতে ঝুলে থাকা ছবি অনবরত শব্দ পালটায়, দৃশ্য পালটায়,
শরীর পালটায়, আঙুল থেকে আঙুলে,
তবুও প্রকৃত প্রেমিকার ছবি লুকোনো থাকে,
লুকানো আছে যেমনি সিন্থিয়া ডিসুজার দেওয়া প্রথম গোলাপ...
আদ্রে,
তোমাকে বলা হয়নি আমি যে ডায়েরির কথা বলতে চেয়েছি
তাতে এখনও প্রেমিকের প্রকৃত নাম খুঁজে পাইনি
অথচ আমি আরও অনেকটা ইথিউপিয়ান হ্রদ পার হয়ে গেছি
নাবিকের সাথে...
ডায়েরি ও মুখোশ ৪
কতগুলি সম্পর্ক এমনিতেই ভেঙে যায়। বাতাসে কান পেতেও জানা যায়না।
উদ্দাম ঝড়ের সাথে দীর্ঘদিন সহবাস থেকে ফিরে নাবিক এসে বসে
লৌকিক সভ্যতার কাটা ফসলের বহুলতার গন্ধে।
আমি তার কানে কানে বলি ...
আমি তার স্বপ্নে আসি...
আমি তার ছন্দে গিটারের স্কেল খুঁজি অতল সমুদ্রের পাড়ে।
ফেরা হয়নি জাপানি তরুণের স্বপ্নে,
অথচ প্রেমিকের মতো বাতাস আমায় ঘিরে ফেললেই
আমি উন্মাদ হয়ে যাই প্রতিটা ফুলের মতো...
উন্মাদ হয়ে যাই আমার ঘরে বাদামি ডায়রির পাতায়...
তুমি চশমার শরীরে ঘন ঘন ঘাম মুছে নাও ; বৃষ্টির উল্লাসে।
সম্পর্কের দাড়ি বহুকাল আগেই বটের ঝুরির মত নেমে গেছে ,
উত্তর আকাশ তোমায় প্রশ্রয় দিতে দিতে ধুলো পড়ে গেছে
অনেকটা আদ্রির মেষ খামারের মতো ।
আমি বহুবার প্রফেসার ডিকস্টার ঘরের সামনে দাড়িয়ে থেকে
একই দৃশ্য বারবার দেখেছি ...
ভেবেছি এখনই পালিয়ে যাওয়া উচিৎ আরও উত্তরে
যেখানে হলদে সব পাতার শরীর কেটে কেটে
আদিবাসী নৃত্যের ছবি আর প্রেমিকার নাম লেখা থাকবে,
অনন্ত আমার জন্য ...
অনন্ত আমার জন্য বসন্তে ফেলে যাওয়া
পাখির পালক কেউ তুলে রাখবে।
আমি জাপানি তরুণকে বহুবার খুঁজেছি মিশরীয় মালভূমিতে।
গোলাপী উপহারে অপেক্ষা করেছি সভ্যতার শেষ পর্যন্ত।
আমি এভাবেই একটু একটু করে পার হয়ে যাছি ইথিওপিয়ান হ্রদ
আর তোমায় লিখছি খুঁজে পাওয়া কোন প্রেমিকের ডায়রির কথা...
ডায়েরি ও মুখোশ ৫
প্রতিদিন শব্দের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে দেখেছি সেখানে প্রকৃতির মত সুন্দর অথবা খুনির মত নৃশংস অবয়ব ভেসে বেড়ায়। ভেসে বেড়ায় আমাদের প্রতিকূল -অনুকূল হাওয়া। নাবিক ও তার সঙ্গীর কাপড়ে টুকরো টুকরো রক্তের দাগ দেখে নিয়ে চিল উড়ে যায়, বিপন্ন ঘুড়ি হারিয়ে যায় অদৃশ্য চিলেকোঠায়। বেগুনী আলোর সাথে মুখোমুখি বহুদিন মুখোমুখি একদিন হতে হয় যখন শীতের পাতার মত চুপচাপ- চুপচাপ বসে থাকে কেউ, সেই ভাবে বহু রাত বসে থেকে থেকে অলীক শব্দের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি একা...
এখনও ...
এই ভাবে দেখার আগে বাতাসে চুল উঁকি ঝুঁকি দেয়, উঁকি ঝুঁকি দেয় চৌকাঠে। সিন্থিয়া ডিসুজার কপাল বেয়ে নেমে যায় সূর্য। এখানে অন্ধকার বলতে ভাঙা কাচের শিশি আর কতগুলি এলোমেলো চিঠি । এখানে চুম্বনের গাঢ় দাগ মুছে ফেলেছে সামুদ্রিক সংলাপ। অনেকদিন চোখের পাতা একসাথে ভিজে জড়ো হয়ে থাকতে থাকতে মনে হয় কোনও চিত্র শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা কোনও প্রেমিকার চোখ অভিমানে তাকিয়ে আছে, তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে যেখানে ভবিষ্যৎ অথবা অতীতের নিঃশ্চুপ দৃষ্টি...
নিকোলাস আদ্রে , আমার সম্মোহিত আঙুলের ধাক্কায় উলটে পালটে যাচ্ছে ডায়েরির প্রতিটা পাতা, আর ক্রমশ সন্ধ্যের মত নৃশংস হয়ে উঠছে সমস্ত শব্দ... আহ! আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমি মিশরীয় মালভূমিতে তোমার মেষ খামার নেই জেনেও খোঁজ করে গেছি ... উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি বাদামি ডায়রির পাতায় ...
রাত যত বাড়ছে ততই নাটকীয় অবয়ব গুলি অস্পষ্ট শব্দে ঠোঁট নেড়ে চলেছে মাথার ভেতরে, ডায়েরির পাতায় ঝুলে থাকা ছবি অনবরত শব্দ পালটাচ্ছে , দৃশ্য পালটাচ্ছে, অথচ দেখো একটু একটু করে আমি আরো অনেকটা ইথিওপিয়ান হ্রদ পার হয়ে গেছি নাবিকের সাথে নীলাভ চেয়ারে পিঠ এলিয়ে...
ডায়েরি ও মুখোশ ৬
আদ্রে, না আর কোনও চিঠিই তোমায় লিখবো না
অভিমানগুলি নৌকা হয়ে ভেসে গেছে বৃষ্টির সাথে
চৌদ্দ বছর পার করে দিলে তোমার পঞ্চাশ ছুঁয়ে যাবে
আমার উনচল্লিশ অথবা বেয়াল্লিশ ; মুখ আর মুখোশে ...
আদ্রে, তোমার সাথে সাথে মেষ খামারের স্বপ্ন গুলি
ভাসিয়ে দিয়েছি, যেভাবে ভাসিয়ে এসেছি একে একে
বাদামী ডায়েরির পাতা ও এলিস অথবা সিন্থিয়ার কান্না ।
এখানে একা একা শীত নেমে এলে আমি প্রেমিকার জন্য প্রতীক্ষা করবো
ধূসর হলুদ জীবন যাপনের বেয়াল্লিশে দেখা হবে মাস্তুলে তুলে রাখা স্বপ্নে
জানি কোনও ডায়রির পাতায় কুয়াশার বিকেল জড়িয়ে ধরে মৃদু কাঁদবে
হাসবে অথবা গাল ফুলিয়ে আমায় আড় চোখে লক্ষ্য করবে অথচ এগিয়ে আসবে না ...
আদ্রে ,
আমি সাংহাইয়ের স্রোতে জাপানী তরুণের উজ্বল হাসি ত্যাগ করেছি
জাপানী তরুণীর দেওয়া প্রথম গোলাপ আগ্রাহ্য করে গেছি অকারণে
অথচ তুমি জানতে
আমার ছোট নদীর মত তোমার ঝাউপাতা আর
রোদ্দুর থেকে তুলে আনা ভোরের প্রথম আলোর চুম্বন লুকিয়ে রেখেছি ...
এলিসের চোখের মত চঞ্চল হয়ে কেটে যাবে আরও চৌদ্দ বছর
আমার পাঞ্জাবী শরীর মানুষের ভিড়ে সাদা সাদা রেখাচিত্র – মানচিত্র
এঁকে আবার মিলিয়ে যাবে
আদ্রে ,
তোমায় আর কোনও দিন চিঠি লিখবো না
জানাবো না খুঁজে পাওয়া কোনও প্রেমিকের বাদামী ডায়েরির কথা
তোমার পঞ্চাশ ছোঁয়া কোনও বিকেলে দেখা হয়ে গেলে জানতে চেওনা
কিভাবে আমি ইথিওপিয়ান হ্রদ পার হয়ে গেছি চুপচাপ চুপচাপ ...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন